
আসাদুজ্জামান খান মুকুল
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন আমরা উদ্বিগ্ন হই, তখন অনিবার্যভাবেই প্রথমে চোখে পড়ে শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা। এই স্তরেই শিশুর হাতে তুলে ধরা হয় চিন্তার প্রথম বীজ, শেখানো হয় প্রশ্ন করতে, বুঝতে ও স্বপ্ন দেখতে। প্রাথমিক শিক্ষা যেকোনো জাতির মেরুদণ্ড, যা নির্ধারণ করে দেয় জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও মানবিকতার দৌড়ে একটি জাতি কতদূর এগোবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের এই ভিত্তি আজ গভীর সংকটের মুখে। প্রায় দুই কোটি শিশুর শিক্ষার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা আজ হতাশা, ক্ষোভ ও বঞ্চনায় জর্জরিত। সরকারের অঙ্গীকার ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ব্যবধান শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্রমেই দুর্বল করে তুলছে।
একজন অসন্তুষ্ট শিক্ষক কখনোই পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করতে পারেন না। সামাজিক মর্যাদাহীনতা, আর্থিক বৈষম্য ও জীবনধারণের অনিশ্চয়তা শিক্ষকের পক্ষে কেবল কর্তব্যবোধ দিয়ে জ্ঞানের আলো ছড়ানোকে কঠিন করে তোলে। প্রাথমিক শিক্ষার এই অবনতি শুধু ফলাফলের সংকট নয়, এটি জাতীয় অগ্রগতির জন্য এক গভীর হুমকি।
প্রাথমিক শিক্ষকতা আজ দেশের অন্যতম বৈষম্যপূর্ণ পেশা। একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমমানের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বেতন গ্রেডে চরম পার্থক্য বিদ্যমান। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যেখানে ১৩তম গ্রেডে, সেখানে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পান ১০ম গ্রেড। একই কারিকুলাম ও দায়িত্ব পালন করেও এই বৈষম্য শিক্ষকদের মধ্যে হীনমন্যতা ও ক্ষোভ জন্ম দিচ্ছে। এটি কেবল আর্থিক নয়, মর্যাদার প্রশ্ন।
পদোন্নতির সুযোগ না থাকা এবং বকেয়া টাইমস্কেল ঝুলে থাকা শিক্ষকদের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা। দশ ও ষোলো বছর পূর্তির আর্থিক সুবিধা বছরের পর বছর না পাওয়ায় শিক্ষকরা পেশাগত স্থবিরতায় ভুগছেন। আদালতের জটিলতায় পদোন্নতির ফাইল আটকে থাকায় বহু শিক্ষক একই পদে থেকে অবসরের পথে হাঁটছেন, যা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও বহু বিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষক সংকট রয়েছে। হাজার হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এতে পাঠদান হয়ে উঠছে দায়সারা এবং শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রশিক্ষণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব প্রকট। চার্ট, মডেল ও ডিজিটাল কনটেন্ট না থাকায় প্রশিক্ষিত শিক্ষকও পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরতে বাধ্য হন। ফলে প্রশিক্ষণের সুফল নষ্ট হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ফলেই শিক্ষকরা পরীক্ষা বর্জন ও শাটডাউন কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এটি কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট নিরসন না হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে।
শিক্ষকদের প্রধান দাবি-দশম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ, শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি এবং বকেয়া টাইমস্কেল প্রদান-কেবল ব্যক্তিগত নয়, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট। এই দাবিগুলো পূরণ হলে শিক্ষকের মর্যাদা ও পেশাগত উদ্দীপনা বাড়বে, যা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের পূর্বশর্ত।
উপসংহার
শিক্ষকের সম্মান রক্ষা মানেই ভবিষ্যৎ রক্ষা। অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষকের মানসিক শান্তি নিশ্চিত করাই প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়নের মূল শর্ত। এখনই সময় শিক্ষকের ন্যায্য দাবি পূরণ করে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থিতি ফিরিয়ে আনার।
শিক্ষক কবি ও প্রাবন্ধিক