
মো ইয়াকুব আলী তালুকদার, স্টাফ রিপোর্টার
ইসলামী আইনের ব্যবস্থাবদ্ধকরণের প্রক্রিয়া এবং এর কঠিন পথ। ইসলামী আইন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের পর থেকেই ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হতে শুরু করে। পবিত্র কুরআন এর প্রধান উৎস এবং হাদিস ও সুন্নাহ তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তৎকালীন সমাজে পুরোনো অবক্ষয়িত মূল্যবোধের পরিবর্তে নতুন নৈতিকতা ও জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। তাই এই পরিবর্তন ধীরে ধীরে সম্পন্ন হয়।
মহানবী (সা.)-এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর নির্দেশনায় একটি নৈতিক ও উন্নত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিধান পর্যায়ক্রমে দেওয়া হয় এবং এর মাধ্যমে নতুন সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে শরিয়াহ আজকের মতো বিস্তৃত ও সুসংগঠিত ফিকহি কাঠামোতে ছিল না। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ও মুস্তাহাব ইত্যাদি শ্রেণিবিভাগ পরবর্তী সময়ে আলেমদের গবেষণা ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে।
পরবর্তীতে হানাফি, মালিকি, শাফিঈ ও হাম্বলি মাযহাবসহ বিভিন্ন ফিকহি ধারার বিকাশ ঘটে। আলেমদের মতপার্থক্য সবসময় বিরোধ ছিল না; অনেক ক্ষেত্রে তা ছিল জ্ঞান, যুক্তি ও গবেষণার সুস্থ প্রতিযোগিতা। এর ফলে ইসলামী জ্ঞানচর্চা সমৃদ্ধ হয়।
পরবর্তী সময়ে গ্রিক, বিশেষ করে এরিস্টটলীয় দর্শনের প্রভাব মুসলিম চিন্তাজগতে প্রবেশ করে। কুরআন ও ইসলামী বিশ্বাসকে যুক্তি ও দর্শনের মাধ্যমে ব্যাখ্যার চেষ্টা থেকে বিভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের সৃষ্টি হয় এবং তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
এসব চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়ায় কিছু আলেম ইসলামী বিশ্বাস রক্ষায় আরও রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেন। এর ফলে ইসলামী আইন ও ধর্মীয় চিন্তা ধীরে ধীরে আরও নিয়ন্ত্রিত ও কাঠামোবদ্ধ হয়ে ওঠে। আমার মতে, এর একটি নেতিবাচক প্রভাবও ছিল। অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ মুক্ত বুদ্ধিচর্চা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নতুন চিন্তার পরিবর্তে পূর্ববর্তী ব্যাখ্যা অনুসরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তীতে মুসলিম সমাজে “ইজতিহাদের দরজা বন্ধ” হয়ে যাওয়ার ধারণা শক্তিশালী হয়। আইনগত প্রশ্নে প্রতিষ্ঠিত মাযহাবগুলোর মতামতের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। আমার মতে, এর ফলে মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে বৌদ্ধিক স্থবিরতার দিকে চলে যায় এবং নতুন জ্ঞান ও গবেষণার গতি কমে যায়।
সামরিক পরাজয় ও রাজনৈতিক দুর্বলতার ফলে মুসলিম বিশ্বের বড় অংশ বিদেশি আধিপত্যের অধীনে চলে যায়। এই আধিপত্য পরবর্তীতে অর্থনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতেও বিস্তৃত হয় এবং মুসলিম সমাজের স্বাধীন বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
তবে বর্তমান বিশ্বে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মুসলিম সমাজকে এখন ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধ বজায় রেখে স্বাধীন চিন্তা, ইজতিহাদ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যুক্তিবোধ ও নতুন বাস্তবতার উপযোগী আইনগত চিন্তা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।
ইসলামের জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য আমাদের দেখায় যে স্বাধীন চিন্তা ও গবেষণাই মুসলিম সভ্যতাকে একসময় বিশ্বসভ্যতার অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করেছিল। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে আবার এগিয়ে যেতে হবে।