
সুমন চন্দ্র দে, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বহিরাগত শেফায়ত ইসলাম নয়নের প্রভাব বিস্তার, দাপ্তরিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা এবং ভূমিসেবা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। সরকারি কর্মচারী না হয়েও তাঁকে অফিসের কম্পিউটারে বসে কাজ করতে দেখা যাওয়া, সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণের আলমারির চাবি তাঁর কাছে থাকার অভিযোগ এবং নামজারি, দাখিলা ও পুরোনো খতিয়ান-সংক্রান্ত সেবায় তাঁর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ও ভুক্তভোগীরা। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে শাপলাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গিয়ে শেফায়ত ইসলাম নয়নকে অফিসের কম্পিউটার টেবিলে বসে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায়। এমনকি পরিচয় গোপনকারী সংবাদকর্মীর সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি খতিয়ান খোলার বিষয়ে নিশ্চয়তা দেন। তবে তাঁর এ ধরনের কাজের জন্য কোনো সরকারি অনুমোদন বা আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বর্তমানে শাপলাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফিরোজ এবং ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা শামসুন্নাহার। সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাইরে একজন ব্যক্তি কীভাবে অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার করে ভূমি-সংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফি ও প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থের বিনিময়ে নামজারি, দাখিলা কাটা এবং বহু পুরোনো কবলাসংক্রান্ত খতিয়ান সংগ্রহের কাজে নয়নের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁদের দাবি, তাঁর সম্মতি ছাড়া ভূমিসেবার বিভিন্ন ফাইলের কাজ এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেনের নথি বা নির্দিষ্ট ফাইলের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফিরোজ সপ্তাহের এক দিন শাপলাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করায় শাপলাপুর অফিসের কার্যক্রমে নয়নের প্রভাব আরও বেড়েছে। সপ্তাহের বাকি সময়েও তিনি অফিসের বিভিন্ন কাজে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণের আলমারি এবং পুরো অফিসের চাবি নয়নের কাছে থাকে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
অভিযোগটি সত্য হলে সরকারি নথির নিরাপত্তা, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং অনুমোদনহীন ব্যক্তির প্রবেশাধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দেয়।
এছাড়াও ভূমি অফিসের নিয়ন্ত্রণাধীন গাছপালা ও একটি পুকুরের ইজারা বা লিজ বাবদ অর্থ নয়ন নিজে গ্রহণ করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি অফিসের কয়েকটি গাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে গাছ কাটার অনুমোদন, বিক্রির অর্থ এবং সংশ্লিষ্ট হিসাবপত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সরকারি সম্পত্তি থেকে আয় করা অর্থের রসিদ, জমার প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করলে এ বিষয়ে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
শাপলাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা শামসুন্নাহারের কাছে অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এই অফিসে যোগদান করেছি প্রায় আড়াই মাস আগে। যোগদানের পর থেকেই নয়নকে এই অফিসে কাজ করতে দেখছি। যতদূর জানি, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ফিরোজ সাহেব তাঁকে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।”
তবে সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো বহিরাগত ব্যক্তি ভূমি অফিসের কম্পিউটার ব্যবহার করে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন কি না, সরকারি নথিপত্রের চাবি তাঁর কাছে রাখা বিধিসম্মত কি না এবং ভূমিসেবার অর্থ আদায়ে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুনরায় বক্তব্য নিতে ভূমি অফিসে গেলে নয়নকে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাড়িতে আছেন বলে জানান। এরপর তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি থেকে বের হয়েছেন। একাধিক নম্বর থেকে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে, প্রতিবেশীদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি কর্মচারী না হয়েও ভূমি অফিসে কাজ করার সুযোগ কীভাবে পেলেন নয়ন এবং অল্প সময়ে সিসিটিভি ক্যামেরা ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকা একটি বাড়ি নির্মাণের অর্থের উৎস কী। তবে তাঁর বাড়ি বা সম্পদের বিষয়ে ওঠা প্রশ্নের পক্ষে কোনো আর্থিক নথি কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুধু বাড়ির অবকাঠামো দেখে অর্থের উৎস সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোরও সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবায়েত আহমেদ এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের গাছ কাটার বিষয়ে তিনি অবগত নন।
স্থানীয়দের মতে, ভূমি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায় কিংবা অনুমোদনহীন ব্যক্তির প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত, নামজারি ও দাখিলার নথি পরীক্ষা, সরকারি ফি আদায়ের হিসাব যাচাই এবং সরকারি সম্পত্তি থেকে আয় করা অর্থের হিসাব পর্যালোচনা করা জরুরি।
একই সঙ্গে শাপলাপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা, বহিরাগত ব্যক্তির দাপ্তরিক কাজে সম্পৃক্ততার অনুমোদন এবং সরকারি নথিপত্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।