1. admin@bangladeshkhabarpratidin.com : admin :
বাংলাদেশে মারাত্মক 'সীসা দূষণ': ঝুঁকিতে ৩ কোটির বেশি শিশুর ভবিষ্যৎ - বাংলাদেশ খবর প্রতিদিন
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
পাঁচবিবিতে মাদকবিরোধী পোস্টের জেরে যুবকের ওপর হামলার অভিযোগ। পুঠিয়ায় আপন ভাইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাংচুর ও লুটপাটের অভিযোগ। ব্যারিস্টার ড. নাজিবুর রহমান এমপিকে সংবর্ধনা প্রদান। নড়াইলে প্রতিবন্ধী আনোয়ার হত্যা মামলার এক আসামি গ্রেফতার। দেবীগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধার মৃত্যু। ন্যায্য দামের অভাবে দিশেহারা মহেশখালীর পান চাষিরা, বাড়ছে ঋণের বোঝা মহেশখালীতে ৬০ শতাংশ পরিবার পান চাষের সঙ্গে জড়িত, ন্যায্যমূল্য ও সরকারি সহায়তার দাবি। চট্টগ্রাম মিরসরাইয়ে গৃহবধূর আ/ত্ম/হ/ত্যার ঘটনার মামলায় স্বামী গ্রে/ফ/তার । শাহজাহানপুর তরুণ সংঘের ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে চ্যাম্পিয়ন শাহী হালিম জামতৈল। সাতক্ষীরায় বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত। সাংবাদিক মাসুদ রানা ও সোহাগের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ: মাছখোলা বাজারে দৃষ্টিনন্দন বসার জায়গা স্থাপন।

বাংলাদেশে মারাত্মক ‘সীসা দূষণ’: ঝুঁকিতে ৩ কোটির বেশি শিশুর ভবিষ্যৎ

তাওহীদ হাসান পিয়াল - খুকৃবি প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
  • ৪৬ বার পঠিত

তাওহীদ হাসান পিয়াল – খুকৃবি প্রতিনিধি

বাংলাদেশে সীসা (লেড) দূষণ বর্তমানে একটি নীরব ও ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণা প্রমাণ করেছে, এই সংকটের প্রধানতম এবং একক বৃহত্তম উৎস হলো দেশের গণপরিবহন খাতে দাপিয়ে বেড়ানো লাখ লাখ অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ইজি-বাইক। এই বাহনগুলোতে ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি (Lead-acid battery) অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল করার প্রক্রিয়াই আজকে দেশের বাতাস, মাটি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিষাক্ত করে তুলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে সীসা দূষণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ওপরের সারিতে। দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ শিশু, যা মোট শিশুর প্রায় ৬০ শতাংশ, বর্তমানে রক্তে উচ্চমাত্রার বিষাক্ত সীসা নিয়ে বড় হচ্ছে।
ব্যাটারি রিকশাই কেন প্রধান কারণ? বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও সমীক্ষা:
গবেষকদের মতে, একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা সচল রাখতে ৪ থেকে ৫টি ভারী সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির প্রয়োজন হয়। অত্যন্ত কম স্থায়িত্বের কারণে প্রতি ৮ থেকে ১০ মাস পর পর এই ব্যাটারিগুলো কার্যক্ষমতা হারায় এবং তা পরিবর্তন করতে হয়। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামীণ জনপদে গড়ে উঠেছে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার এক বিশাল নেটওয়ার্ক।
এই বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত ব্যাটারি বৈজ্ঞানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে রিসাইকেল করার কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। ফলে অকেজো ব্যাটারিগুলো চলে যায় এক শ্রেণীর অবৈধ ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী এবং অনুমোদনহীন কারখানার হাতে। লোকালয়, ফসলি জমি বা নদীর তীরে গড়ে ওঠা শত শত অবৈধ ‘ব্যাটারি গলানো’ কারখানায় কোনো রকম নিরাপত্তা বা পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই খোলা আকাশে ব্যাটারি ভেঙে সীসা বের করা হয় এবং তা গলানো হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিষাক্ত সীসার ধোঁয়া বাতাসে মিশে ফুসফুসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ঢুকছে এবং এর বর্জ্য আশপাশের মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিকে স্থায়ীভাবে বিষাক্ত করে তুলছে।

আইসিডিডিআর,বি (icddr,b) ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা: বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার আশপাশের এলাকায় পরিচালিত এই যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানকার মাটির কণা ও বাতাসে সীসার উপস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে শতগুণ বেশি। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, এসব কারখানার নিকটবর্তী এলাকার শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করে প্রতি ডেসিলিটারে সর্বোচ্চ ৪৭ মাইক্রোগ্রাম (µg/dL) পর্যন্ত সীসা পাওয়া গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে রক্তে সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই, তবে ৫ µg/dL হলেই তা চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

পিওর আর্থ (Pure Earth) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা: পরিবেশবাদী সংস্থা পিওর আর্থ বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের ৩০০টিরও বেশি ‘সীসা দূষণের হটস্পট’ (দূষিত এলাকা) চিহ্নিত করেছে। সংস্থাটির রিপোর্ট অনুযায়ী, এই হটস্পটগুলোর প্রায় সবকটিই হলো অবৈধ ব্যাটারি ভাঙা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ সংলগ্ন এলাকা। এসব এলাকার মাটির উপরিভাগে সীসার মাত্রা আন্তর্জাতিক সীমার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS): বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও ইউনিসেফের এই জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৮.৩ শতাংশেরই রক্তে সীসার বিপজ্জনক উপস্থিতি রয়েছে, যার মূল কারণ হিসেবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাটারি রিকশার ব্যাটারি চার্জিং গ্যারেজ ও ভাঙাড়ি দোকানগুলোর অবস্থানকে দায়ী করা হয়েছে।

শিশুর শরীরে এর মারাত্মক প্রভাব:
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীসা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী নিউরোটক্সিন বা স্নায়ুবিষ, যার কোনো নিরাপদ মাত্রা মানুষের শরীরে নেই। এটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এবং ইউনিসেফ পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS)’-এর জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৮.৩ শতাংশেরই রক্তে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি মাত্রায় সীসার উপস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় এই হার সর্বোচ্চ ৬৫ শতাংশ।

​আইসিডিডিআর,বি (icddr,b) এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার আশপাশের এলাকার শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা ৪৭ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার (µg/dL) পর্যন্ত পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক (রক্তে ৫ µg/dL সীসা থাকলেই তা ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়)। এই বিষক্রিয়ার ফলে শিশুরা স্থায়ীভাবে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষক কর্তৃক ল্যানসেট (The Lancet) জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সীসা দূষণের কারণে বাংলাদেশে শিশুরা বছরে প্রায় ২ কোটি আইকিউ (IQ) পয়েন্ট হারাচ্ছে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বছরে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।

মাঠপর্যায়ে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে অবৈধ ও অনুমোদনহীন সীসা গলানোর ব্যাটারি কারখানাগুলো সিলগালা করছে এবং জরিমানা করছে। তবে পরিবেশবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। ব্যাটারিচালিত রিকশার এই বিশাল খাতকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে, ব্যাটারি রিসাইক্লিং প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে এবং লোকালয়ের ভেতর ব্যাটারি ভাঙা ও গলানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। অন্যথায়, দেশের কোটি কোটি শিশুর মেধা ও ভবিষ্যৎ এই বিষাক্ত সীসার গ্রাসে হারিয়ে যাবে।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ বাংলাদেশ খবর প্রতিদিন
প্রযুক্তি সহায়তায় Shakil IT Park