
মোঃ বেলাল হোসেন স্টাফ রিপোর্টার সিরাজগঞ্জ
বাঙালির যাপিত জীবনে কালের বিবর্তনে অনেকে গামছার পরিবর্তে তোয়ালে ও রুমাল ব্যবহার করলেও গামছার চাহিদা এতটুকু কমেনি। আর সেই চাহিদাকে মাথায় রেখে সিরাজগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এখনো তৈরি হচ্ছে বাহারি রঙ আর নকশার গামছা। এই গামছা বিক্রির জন্যই বছরের পর বছর জেলার পাঁচলিয়ায় বসছে শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী গামছার হাট। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ও শুক্রবার উল্লাপাড়া উপজেলার এই হাটে বসে রঙের মেলা। দেশের সর্ববৃহৎ এই গামছা হাটে প্রতি হাটবারে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়। গুণগতমান ভালো হওয়ায় সিরাজগঞ্জের উৎপাদিত গামছা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে ভারত, মিয়ানমারের পাশাপাশি ইউরোপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তবে এ হাটে ব্যবসায়ীদের জন্য নেই আবাসন ও অবকাঠামো সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছে ক্রেতা-বিক্রেতারা। এমনকি রং সুতার দাম বৃদ্ধি আর হাটে সিন্ডিকেটের কারণে গামছা তৈরি করে পুষিয়ে উঠতে পারছেন না তাঁতীরা। এতসব সংকটের মধ্যেও সিরাজগঞ্জের গামছাকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় আশার আলো দেখছে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড।
পূর্বআকাশে ভোরের আলো ঠিকমতো ফোটার আগেই জেগে ওঠে সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়া। শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পশ্চিমে, যমুনা সেতুর পশ্চিম প্রান্তের কাছে পাঁচলিয়া বদরুল আলম উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ভোর থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত চলে এই হাটের কেনাবেচা। চারপাশ যখন আবছা অন্ধকারে ঢাকা, তখনই দূর-দূরান্ত থেকে আসা তাঁতি আর পাইকারদের পদচারণায় মুখর হতে শুরু করে পুরো এলাকা। নিজেদের তৈরি রঙ-বেরঙের গামছার রঙিন বোঝা নিয়ে নিয়ে তাঁতিদের হাঁকডাক, আর দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের দরাদরি—এই দুইয়ে মিলে প্রাণ ফিরে পায় চারপাশ। পাঁচলিয়ার মানুষের কাছে এটি শুধু একটি পণ্য নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মে বয়ে চলা এক উত্তরাধিকার, তাদের জীবন-জীবিকার মূল অবলম্বন। কাঁধে গামছার বোঝা নিয়ে বিক্রেতাদের হাঁকডাক আজও হাটের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়, জানান দেয় তাদের টিকে থাকার গল্প। বাপ-দাদার পথ ধরেই নতুন প্রজন্মও ভোরের আলো ফোটার আগেই মাথায় গামছার বোঝা নিয়ে হাজির হয় এই হাটে, দিনের প্রথম বেচাকেনার অপেক্ষায়। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ও শুক্রবার উল্লাপাড়া উপজেলার এই হাটে বসে রঙের মেলা। যেখানে ১ হাত থেকে ৫-৬ হাত পর্যন্ত লম্বা বাহারি গামছা পাওয়া যায়। ৪ পিচে থান হওয়ায় প্রকার ভেদে প্রতি থান ২শ টাকা থেকে ৭শ টাকা দামে পাইকারী বিক্রি হয়। জেলার বিভিন্ন স্থানের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়িরা এই হাটগুলোতে এসে পাইকারি দামে গামছা ক্রয় করে নিয়ে যায়। সপ্তাহে দুইদিনে দেশের সর্ববৃহৎ এই গামছার হাটে প্রতিবারে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই হাটের গামছার খ্যাতি এখন শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, মিয়ানমারের পাশাপাশি ইউরোপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ার প্রবাসীদের মধ্যেও এখানকার গামছার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে
তাঁত সমৃদ্ধ জেলা সিরাজগঞ্জ। এখানকার তৈরি তাঁতের শাড়ির যেমন সুনাম রয়েছে তেমনি সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, পাঁচলিয়া, নলকা, পাইকোশা, আমডাঙ্গাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে তৈরী হয় বাহারি ধরনের গামছা। উৎপাদিত গামছা বিক্রি হচ্ছে পাঁচলিয়ার হাটে। দেশের সবচেয়ে বড় শতবর্ষীর গামছার হাট আজও সিরাজগঞ্জের তাঁতশিল্পের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তবে রং সুতার দাম বৃদ্ধি আর সিন্ডিকেটের কারণে গামছা তৈরি করে পুষিয়ে উঠতে পারছেন না উৎপাদকেরা। উৎপাদক ও বিক্রেতাদের অভিযোগ বর্তমানে রং সুতার মূল্য বৃদ্ধিসহ বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই এই শিল্পটি। এমনকি প্রতি সপ্তাহের দুইদিন হাটে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের নিরাপত্তা ও আবাসনের জন্যও নেই কোন ব্যবস্থা। দ্রুত গামছার শিল্প টিকিয়ে রাখতে রং-সুতার দাম নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণের দাবি জানান এ অঞ্চলের তাঁতীরা।
তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋণ, আর্থিক সহযোগিতা করা হচ্ছে। সুতা ও রঙের বাজার নিয়ন্ত্রণসহ গামছা উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে বাজার ব্যবস্থা মনিটরিং করাসহ তাঁতীদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানান তাঁতবোর্ডের এই কর্মকর্তা।
SOT: অমিত সরকার, লিয়াজো কর্মকর্তা, তাঁত বোর্ড, সিরাজগঞ্জ।
সপ্তাহে দুইদিন বসা দেশের সর্ববৃহৎ সিরাজগঞ্জের এই গামছা হাটে প্রতিবার ২ থেকে ৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়। প্রতি বছর এই হাট থেকে ২০/২২ লাখ টাকার রাজস্ব পায় সরকার। এই হাট শুধু বেচাকেনার কেন্দ্র নয় বহন করছে বাংলার ঐতিহ্য আর অবদান রাখছে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও।