
মাহী ছিদ্দীকী সিয়াম। নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। তবে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এখন যেন সংকট আর অব্যবস্থাপনার এক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসন সংকট, প্রয়োজনীয় বইয়ের অভাব, দুর্বল ইন্টারনেট এবং শব্দ দূষণে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় লাইব্রেরির আসন সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে অনেকেই পড়তে এসে সিট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও ক্যারিয়ারভিত্তিক বইয়ের তীব্র সংকট, যা তাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। লাইব্রেরিতে নেই কাঙ্ক্ষিত নীরবতা। আশপাশের কোলাহল ও সাউন্ডপ্রুফ ব্যবস্থার অভাবে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তীব্র গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘসময় পড়াশোনা করাও কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে বিকল ফটোকপি মেশিনের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহে ভোগান্তিতে পড়ছেন। দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধার অভাবও গবেষণা ও অনলাইন রিসোর্স ব্যবহারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কাগজে কলমে লাইব্রেরী ভবন নামে ৪ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন থাকলেও বাস্তবে সেখানে চলমান রয়েছে বিভিন্ন বিভাগের কার্যক্রম এবং কিছু কক্ষ পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধুমাত্র ভবনের নিচ তলা এবং ২য় তলার ১ টি রুমে চলছে লাইব্রেরির কার্যক্রম। অতিশীঘ্রই লাইব্রেরির আসন সংকট নিরসন, ইন্টারনেট সেবার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত বই সরবরাহ, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, এসি প্রতিস্থাপনসহ লাইব্রেরিকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তোলার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিন সুলতানা তনিমা বলেন,আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিটি বর্তমানে নানাবিধ অবকাঠামোগত সংকটে জর্জরিত। শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় লাইব্রেরিতে আসন সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য। পর্যাপ্ত সিট না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী লাইব্রেরিতে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া লাইব্রেরির চারপাশের কোলাহল থাকায় শান্ত পরিবেশের অভাবে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় একমনে পড়াশুনায় মনোযোগ দিতে পারেনা।তীব্র গরমে লাইব্রেরিতে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) ব্যবস্থাপনা না থাকায় শিক্ষার্থীদের পক্ষে বেশিক্ষণ বসে পড়াশুনা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইব্রেরিতে প্রিন্টিং সুবিধা না থাকায় প্রয়োজনীয় তথ্যের অনুলিপি সংগ্রহ করতে শিক্ষার্থীদের বাইরে ছুটতে হচ্ছে।একাডেমিক বইয়ের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বইয়ের জন্য গেলেই বলে বইয়ের কপি শেষ বা বই অন্যজনে নিয়ে গেছে।বর্তামানে প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য লাইব্রেরিতে ক্যারিয়ার বিষয়ক বইয়ের সংগ্রহ থাকা অপরিহার্য। কিন্তু আমাদের লাইব্রেরিতে তা নেই।
অভিযোগ জানিয়ে ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম বলেন,আমাদের লাইব্রেরি ও ক্যারিয়ার কর্নার শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে পর্যাপ্ত ক্যারিয়ার বিষয়ক বই নেই। বিসিএস, ব্যাংক চাকরি ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় বইয়ের অভাবে আমরা সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছি না। প্রায়ই শব্দের কারণে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ ক্যারিয়ার কর্নারে প্রয়োজনীয় বই বৃদ্ধি করা এবং লাইব্রেরিতে নীরব ও পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক। এতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।
লাইব্রেরির এ সকল সংকট নিয়ে জানতে চাইলে লাইব্রেরিয়ান(ভারপ্রাপ্ত) ড.মুহাম্মদ আশিকুর রহমান খান বলেন, শিক্ষক,শিক্ষার্থী ও গবেষকদের মানসম্মত গ্রন্থাগার সেবা প্রদানই আমাদের মূল লক্ষ্য। বর্তমানে আমাদের একটি বড় সমস্যা হল আসন সংকট এ সংকট কাটাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি এবং লাইব্ররী ডুপ্লেক্স সিস্টেম করার জন্য কথা বলা হয়েছে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন,” আমরা শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে লাইব্রেরীকে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত করার লক্ষ্যে প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেছি বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিয়ে বলেন এটা আইসিট সেল এ দায়িত্বে,আমরা আইসিটি সেলকে এই বিষয়ে তাগিদ দিব।
তিনি বই সংকট নিয়ে বলেন,আমাদের সংগ্রহে প্রায় ২৭০০০ একাডেমিক বই রয়েছে।আমরা আরো বই বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছি। আমরা চাই ছাত্ররা আমাদের বইয়ের তালিকা দিক সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা করব।
এই বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল জানান, নতুন আসন বাড়ানোর সুযোগ না থাকলেও একাডেমিক ভবন-৩ এর কাজ শেষ হলে বিভাগ স্থানান্তরের মাধ্যমে আসন সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে। বই ক্রয়ে বাজেট অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান।এছাড়া গত বছর প্রায় ৭০ লাখ টাকার বই কেনা হয়েছে, চলতি বছরে কেনা হবে প্রায় ৮০–৯০ লাখ টাকার। গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো ধাপে ধাপে একাধিক কপি করে কেনা হচ্ছে। এছাড়া ফটোকপি মেশিন চালুর বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে নোবিপ্রবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে একাডেমিক বই, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই এবং গল্প ও উপন্যাসসহ প্রায় ২৬৯৭৭ টি বই রয়েছে। এছাড়া, ৮৩১টি প্রিন্ট জার্নাল এবং ১১৬৪ টি ম্যগাজিন রয়েছে।