
আরিখ পাঠান,
হযরত মুহাম্মদ (সা) বিশ্বমানবতার জন্য আল্লাহর অনন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা, “আমি তোমাকে প্রেরণ করেছি বিশ্বজগতের জন্য বিশেষ রহমতস্বরূপ।” (সুরা-আম্বিয়া : ১০৭) তিনি ধনী-দরিদ্র সাদা-কালো সব মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি শুধু দার্শনিকই ছিলেন না বরং তিনি যা আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন তা নিজেই এর বাস্তব নমুনা হিসেবে মানবজাতির জন্য পেশ করেছেন। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন আঞ্জাম দিয়েছিলেন অত্যন্ত সুচারুরূপে। রাসূল (সা) পৃথিবীর সবচেয়ে বর্বর একটি জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করে পৃথিবীতে অনাগতের জন্যও এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন রেখে গেছেন।রাসূল (সা) বিশ্বজাহানে শান্তি প্রতিষ্ঠার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন, সর্বক্ষেত্রে তিনি সফল ব্যক্তিত্ব। জর্জ বার্নার্ড শ’-এর ভাষায় বলা যায়- “If all the world was to be united under one leader then Muhammad (Sallellahu Alaihis-Salam) would have been the best fitted man to lead the people of various needs dogmas and ideas to peace and happiness.”. “সমগ্র দুনিয়াটাকে যদি একত্র করে একজনের নেতৃত্বে আনা যেত তাহলে নানা ধর্মমত, ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তার মানুষকে শান্তি সুখের পথে পরিচালনার জন্য হজরত মুহাম্মদ (সা)-ই হবেন সর্বোত্তম যোগ্য নেতা।” আজ অশান্ত বিশ্বে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, জাতি-গোত্রে হানাহানি সব কিছুর মূলোৎপাটন করে বিশ্বমানবতাকে শান্তির সুশীতল ছায়াতলে আচ্ছাদিত করতে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।
★রাসূল (সা) মানবজাতির জন্য মুক্তির দিশারি রূপে প্রেরিত
আল্লাহ তা’য়ালা যুগে যুগে মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে বিভিন্ন গোত্রের নিকট মহানায়কদের পাঠিয়েছেন, যারা অহির মাধ্যমে মানবজাতির শান্তি নিশ্চিত করতে আমৃত্যু কাজ করেছেন। বিভিন্ন নবী ও রাসূলকে বিভিন্ন গোত্রের জন্য বা নির্দিষ্ট এলাকার জন্য প্রেরণ করলেও রাসূল (সা)কে শেষ নবী হিসেবে সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “আমরা তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী বানিয়ে পাঠিয়েছি।” (সূরা সাবা : ২৮) “হে লোক সকল! তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে এ নবী তোমাদের কাছে সত্যসহকারে এসেছেন, কাজেই তোমরা ঈমান পোষণ কর। এটা তোমাদের পক্ষে কল্যাণকর।” (সূরা নিসা : ১১০) “তিনি আল্লাহ যিনি তার রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য জীবনব্যবস্থাসহ পঠিয়েছেন, যেন তিনি এ দ্বীনকে সমস্ত বাতিল ব্যবস্থাসমূহের ওপর বিজয়ী করেন।” (সূরা ফাতাহ : ২৮)
★রাসূল (সা) ব্যক্তিজীবনে ছিলেন বিশ্বমানবতার মুক্তির অনন্য দূত
১. রাসূল (সা) সেই শৈশব জীবন থেকেই সত্য, পরোপকারিতা, অন্যের অধিকারের ব্যাপারে ছিলেন সদাতৎপর। রাসূল (সা) শৈশবে মা আমিনার কাছ থেকে লালিত পালিত হতে থাকলেন দুধমা হালিমা আস-সাদিয়ার কাছে। তিনি সবসময় মা হালিমার একটি দুধ পান করতেন, অপর দুধটি দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন, কখনো চেষ্টা করেও অপর দুধটি খাওয়ানো যায়নি। সুবহানাল্লাহ! ২. রাসূল (সা) কৈশোরে আরবের পাপাচার ও মিথ্যার প্রলেপে আবৃত নোংরা সমাজব্যবস্থায় সত্যবাদিতার এক অনন্য নজির ছিলেন, তাই তিনি যা বলতেন সবাই বিনাবাক্যে মেনে নিতেন। তাই তাকে সবাই আল-আমিন বা আস-সাদিক বলে ডাকতেন। যদিওবা তিনি যখন আল্লাহর নির্দেশে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ এর ঘোষণা দিলেন তখন মক্কার অধিপতিরা নড়েচড়ে বসলেন। তাঁর উপস্থাপিত মতাদর্শকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে তার প্রতি জুলুম নির্যাতন ও মিথ্যাচার চাপিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর বিশ্বাসের ওপর ছিলেন পাহাড়সম অটল। তিনি বিশ্বাসীদের নিকট এক অনন্য দলিল। তাঁর আদর্শিক দৃঢ়তা দেখে পরবর্তী সময়ে হযরত বেলাল, খোবায়েব-খাব্বাব, আম্মার বিন ইয়াসির ইসলামের ছায়াতলে অংশগ্রহণ করে আত্মত্যাগের এক বিরল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন। যাদের ত্যাগ কোরবানির ইতিহাস পৃথিবীর প্রতিটি অনাগত বিশ্বাসীর জন্য আল্লাহর পথে দৃঢ়পদে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রেরণা জোগাবে। ৩. রাসূল (সা) নবুয়াত প্রাপ্তির পর ইসলামের দাওয়াত প্রচারে তায়েফে সফর করেন। তায়েফবাসীকে ইসলামের পতাকাতলে আহবান জানালেন। তারা রাসূল (সা)-এর দাওয়াত গ্রহণ না করে খারাপ আচরণ করলেন। তায়েফবাসীর (কাফেরদের) আক্রমণে তিনি মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন, শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হয়ে পায়ের সাথে জুতো ও মোজায় জটবেঁধে যায়। এত কষ্টের পরও তিনি আল্লাহর দরবারে তায়েফের কাফেরদের জন্য লা’নত না করে দোয়া করলেন। এতে রাসূল (সা) কত বেশি ধৈর্যশীল ও শান্তিকামী ছিলেন তার পরিচয় বহন করে! ৪. রাসূল (সা) যা বলতেন তা বিশ্বাস করতেন ও কাজে পরিণত করতেন, যা সাহাবীরা স্বচোখে অবলোকন করেছেন। বার্নার্ড শ তার দর্শনে লিখেছেন একজন ব্যক্তির জীবনে একটির বেশি বিয়ে করতে নেই। কিন্তু তিনি জীবনে তিনটি বিয়ে করেছিলেন। একদিন তার এক শিষ্য তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনি আপনার দর্শনের সাথে মিলিয়ে আপনার জীবন পরিচলনা করেন না কেন? তিনি বলেছিলেন যে, দর্শন আর জীবন এক নয়। সে দিক দিয়ে আমরা রাসূল (সা) এর জীবনকে পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই তিনি ছিলেন মানবতার জন্য এক প্রজ্বলিত জীবনদর্শন। যখন খন্দকের যুদ্ধের জন্য পরিখা খননকাজ চলছিল তখন তিনি নিজেই মাটি খননের কাজ করেছিলেন! সাহাবারা তাঁকে কাজে দেখে নিজেরা কাজে আরো বেশি উদ্যমী হলেন। তাঁর ব্যক্তিজীবন সারা জাহানের নেতৃত্বের জন্য আছে অতুলনীয় শিক্ষা।