
কক্সবাজারের সাগরদ্বীপ মহেশখালীর পরিবেশ সংকটাপন্ন সোনাদিয়া দ্বীপে নতুন করে অন্তত এক হাজার একরের প্যারাবনের কেওড়া ও বাইনগাছ ধ্বংস করে তৈরি হয়েছে সাতটি চিংড়িঘের। মহেশখালীতে কতিপয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যু সম্মিলিতভাবে বন বিভাগের মালিকানাধীন সোনাদিয়া উপকূলীয় প্যারাবন কেটে চিংড়ি ঘের নির্মাণে বন বিভাগ’সহ যৌথ বাহিনী উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছে নির্মাণাধীন চিংড়ি ঘরের বাঁধ।
শনিবার (১৭ই মে) দুপুরে উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের দক্ষিণ পশ্চিম এলাকায় এই অভিযানে ৩টি অবৈধ চিংড়ি ঘোনার স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয় ও সুইচগেট ধ্বংস করা হয়। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেয়ে চিংড়ি ঘোনাতে কর্মরত অবৈধ দখলদার ও শ্রমিকগণ পালিয়ে যান বলে জানান প্রশাসন।
এতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হেদায়েত উল্যাহ এর উপস্থিতিতে উক্ত অভিযানে বাংলাদেশ নৌ বাহিনী, মহেশখালী থানা, কোস্টগার্ড মহেশখালী কন্টিনজেন্ট, বন বিভাগ বিভাগের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
এসময় তাদের ব্যবহৃত দা, সোলার প্যানেল, একটি মোটরসাইকেল ও একটি গামবোট জব্দ করা হয়েছে।
জানাগেছে, সোনাদিয়া দ্বীপে অভিযান চালিয়ে প্যারাবন ধ্বংস করে নির্মিত তিনটি চিংড়িঘেরের অস্থায়ী স্থাপনা ( ঘর-গুদাম) গুড়িয়ে দিয়েছে প্রশাসন। তবে কাটা হয়নি ঘেরের বাঁধ। দখলদার কাউকে আটকও করা হয়নি। অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগ ও প্রশাসন সোনাদিয়া চিংড়ি ঘের দখলমুক্ত করতে গিয়ে কয়েকটি অভিযান চালিয়ে দখলদার বা পাহারাদার কাউকে আটক করতে পারেনি। অভিযানের আগে দখলদারদের কাছে অভিযানের খবর পৌছে দেয় ঘটিভাঙা বিট কর্মকর্তা ও স্টাফরা। মুলত অবৈধ ঘের মালিকদের সাথে তাঁদের মাসিক চুক্তি থাকায় তারাই বন রক্ষার নামে দর্শকের ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহেশখালীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ প্যারাবন নিধন, দখল এবং গাছ কাটার ঘটনা ঘটেছে গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুর রহমানের দায়িত্বকালেই। মাত্র দুই বছরের চাকরি জীবনে বিতর্কের বোঝা মাথায় নিয়ে ২০২৩ সালে বিদায় নেন তিনি। স্থানীয় পুলিশ এবং বনবিভাগের সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে দখলদার চক্র ওই সময় প্যারাবনের বিশাল অংশ কব্জা করে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ এবং প্রভাবশালীদের ছায়া ও সহযোগিতা পেয়েই এমন দুর্বার আগ্রাসন চালানো সম্ভব হয়েছে বলে জানান পরিবেশকর্মীরা।
কক্সবাজার শহর থেকে ১১ কিলোমিটার উত্তরে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ছোট্ট দ্বীপ সোনাদিয়া। লাল কাঁকড়া, কাছিম ও বিরল পাখির কারণে এই দ্বীপ সুপরিচিত।
সোনাদিয়া দ্বীপটিকে ২০০৬ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। মানে সেখানকার মাটি, পানি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো পরিবর্তন করা যাবে না।
গত বছর আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা বেজা নিয়ন্ত্রিত ৩ হাজার একরের বেশি প্যারাবন ধ্বংস করে ৩৭টির বেশি চিংড়িঘের নির্মাণ করে। বেজা দখলদারের বিরুদ্ধে তখন একটিও মামলা করেনি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে পরবর্তী কয়েক মাসে আরও এক হাজারের বেশি প্যারাবন ধ্বংস করে সাতটি চিংড়িঘের নির্মাণ করেন বিএনপির নেতা–কর্মীরা।
সোনাদিয়া থেকে ফিরে বিকেলে ইউএনও মো. হেদায়েত উল্যাহ বলেন, সরেজমিন পরিদর্শনের সময় প্যারাবনের গাছ কেটে চিংড়িঘের নির্মাণের সত্যতা পাওয়া গেছে। এমনকি আগুন দিয়ে গাছপালা পোড়ানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে তার চিহ্ন দেখা গেছে।
দখলদারদের কেউ ধরা না পড়ার কারণ জানতে চাইলে ইউএনও মো. হেদায়েত উল্যাহ বলেন, আজকের অভিযানে তিনটি চিংড়িঘেরের অস্থায়ীভাবে তৈরি বেশ কিছু স্থাপনা ( ঘর-গুদাম) গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযানে নামার পর ঘেরের দখলদার ও শ্রমিকেরা পালিয়ে পাশের প্যারাবনে আত্মগোপন করেন। এ কারণে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এ সময় গাছ কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। তা ছাড়া দুটি চিংড়িঘেরে পানি চলাচলের স্লুইসগেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগুন দিয়ে প্যারাবন পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা করতে বন বিভাগকে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপকূলীয় বন বিভাগের মহেশখালী রেঞ্জ কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) আইয়ুব আলী বলেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাগুলো এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। সোনাদিয়া ছাড়া নতুন করে ৩০০ একরের বাইরে কোনো দখলের তথ্য আমার কাছে নেই। তিনি দাবি করেন, দখলদারদের বিরুদ্ধে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে।
তবে বাস্তবে এই নীতি কতটা কার্যকর—তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র সন্দেহ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে, যা প্রশাসনের নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।