
বেবি চক্রবর্ত্তী, কলকাতা:-
সাল ১৯১৫, ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জার্মানরা প্রবল আক্রমণ চালাচ্ছে গ্রেট ব্রিটেনের উপরে। মৃত্যুর সংখ্যা প্রত্যেক দিন বেড়ে চলেছে। বিশেষত যুবকরা যারা সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হচ্ছিলেন বিভিন্ন রেজিমেন্টে তাদের মৃত্যু হচ্ছিল।
হ্যারি লি, এক মিডলসেক্স ক্রিকেট খেলোয়ার, লন্ডন রেজিমেন্টের ১৩তম ব্যাটেলিয়নের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। মে মাসের ৯ তারিখ থেকে তিনি যুদ্ধ করছিলেন আউবার্স রিজে। সেই যুদ্ধে অনুমান করা হয়েছিল তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর পরলৌকিক ক্রিয়া এবং স্মরণসভার আয়োজন করেছিলেন তাঁর বাবা মা। মৃত্যুর ১৫ বছর পর লি তার জীবনের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জোহেন্সবার্গ, ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১।
লি মিডিলসেক্সের একজন ক্রিকেটার ছিলেন। যুদ্ধের সময় বাপায়ে বুলেট লেগে তিনি আহত হন। ফ্রান্সের ভেলিয়েনসীনেস শহরের এক হাসপাতালে ওনাকে নিয়ে যান জার্মান সৈনিকরা। ছয় সপ্তাহ চিকিৎসার পর লি কে জার্মান রেডক্রস সোসাইটির হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি ইংল্যান্ডে ফেরার অনুমতি পান অক্টোবর মাসে এবং নিজের দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।
ডিসেম্বর মাসে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে ছাড়া পান। ব্রিটিশ ওয়ার মেডেল ১৯১৪-১৫, সিলভার ওয়ার ব্যাচ এবং ভিকট্রি মেডেল সম্মানে তিনি ভূষিত হন। লন্ডনের চিকিৎসা চলাকালীন তিনি জানতে পারেন তাঁর পায়ের বেশ কিছু মাসেলের ক্ষতি হয়ে গেছে যার ফলে সারা জীবনের মতো তার পা দুটি অসমান হয়ে যায় (একটি পা ওপর পায়ের থেকে ছোট)।
সামরিক বাহিনীতে থাকার সময় লি সামরিক অফিসে ফাঁইলিং কেরানি হিসেবে কাজ করলেও তিনি তার ক্রিকেট খেলার অভ্যাস ত্যাগ করেননি। রয়েল আর্মি সার্ভিস করপসের হয়ে তিনি লাঞ্চিং কলেজের বিরুদ্ধে শতরান করেন। ইতি মধ্যে তিনি ভারতে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এখানে এসে লি কোচবিহারের মহারাজার অধীনে ফুটবল ও ক্রিকেটে কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন।
১৯১৮ সালের মার্চ মাসে লি ভারতে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে খেলা শুরু করেন কুচবিহার মহারাজা একাদশের হয়ে। প্রথম খেলাতেই তিনি পাঁচটি উইকেট নেন প্রথম ইনিংসে এবং দ্বিতীয় ইনিংসের তিনটি উইকেট যদিও তাঁর দল এক উইকেটে পরাজিত হয়। এরপর তিনি দীর্ঘদিন ভারতে ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যান। ভারতের প্রথম টেস্ট ক্রিকেট অধিনায়ক সি কে নাইডু তাকে “খুব সুন্দর ব্যাটসম্যান” আখ্যা দেন।
১৯১৯ সালে যুদ্ধ অবসানের পরে ইংল্যান্ডে আবার কাউন্টি ক্রিকেট শুরু হয়। লি মিডিলসেক্সের হয়ে খেলা শুরু করেন। ১৯১৯ সালে ১৯ ম্যাচে তিনি করেন ১২২৩ রান। পরের মরশুমে তিনি ২৩ ম্যাচে ১৫১৮ রান করেন ৪৩.৩৭ অ্যাভারেজে। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের ১৬ টি মরশুমে তিনি হাজারের বেশি রান করেছিলেন।
১৯৩১ সাল, হ্যারি লি সেই সময় কাজ করছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সেন্ট অ্যান্দ্রুস কলেজ এবং গ্রাহামসটাউনে রোডস বিশ্ববিদ্যালয়। পারসি চ্যাপম্যানের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ড দলের সাতজন খেলোয়ার সেই সময় আহত হয়েছেন। তৃতীয় টেস্টে ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার জন্য ডাক পান হ্যারি লি। ফেব্রুয়ারি ১৩, ১৯৩১ সালে লি জীবনের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে, তাকে মৃত ঘোষণা করার ১৫ বছর পরে।
গল্প অবশ্য এখানেই শেষ নয়। ইংল্যান্ডের হয়ে খেললেও লি কোনদিনও এমসিসি টুপি বা ব্লেজার পাননি। সাউথ আফ্রিকার যে স্কুলগুলিতে তিনি কাজ করতেন তারই একটি স্কুলের সাথে তিনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ায় তার নামে নালিশ করা হয় যে তিনি সরকারিভাবে না জানিয়ে কাজ ছেড়ে চলে গেছেন। এই কারণে জ্যাক হবস দেখিয়ে দেন লি ইংল্যান্ড ভ্রমণে এসেছিলেন।