
মো ইয়াকুব আলী তালুকদার
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর
গতকাল ১৭ আগস্ট রবিবার বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক,লেখক, সমাজ সেবক,শিক্ষক,কবি ও সাহিত্যিক,শিল্পী উস্তাদ সুলতান নাঈম বলেন
মানুষ যখন আল্লাহর জন্য কাজ করে, তখন তার জীবনের উদ্দেশ্য অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যায়। সাইয়িদ কুতুব রহিমাহুল্লাহর এই অমূল্য বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর কোটি মানুষের ষড়যন্ত্র, কূটকৌশল কিংবা বিরোধিতা কখনোই একজন মুমিনের জন্য প্রকৃত ক্ষতির কারণ হতে পারে না, যদি সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে। মানুষের বিরোধিতা, উপহাস, আক্রমণ—এসব সবই সাময়িক; কিন্তু আল্লাহর জন্য করা প্রতিটি কাজের ফলাফল চিরস্থায়ী।
ইতিহাস সাক্ষী, আল্লাহর পথে কাজ করা মানুষদের বিরুদ্ধে সব যুগেই ষড়যন্ত্র হয়েছে। নূহ আলাইহিস সালামকে তার জাতি উপহাস করেছে, ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছে, মুসা আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে ফেরাউন বিশাল সাম্রাজ্য নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে মক্কার কুরাইশরা বছরের পর বছর ষড়যন্ত্র চালিয়েছে। কিন্তু তাদের কেউই সফল হতে পারেনি। কারণ আল্লাহর প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট: “যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তবে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদসমূহ দৃঢ় করবেন” (সুরা মুহাম্মদ: ৭)।
আজকের সমাজেও আমরা দেখি, যখন কেউ সত্য কথা বলে, অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন অনেক সময় সে একা হয়ে যায়। মানুষ তার বিরুদ্ধে কথা বলে, হাসাহাসি করে, মিথ্যা প্রচার চালায়। অথচ এইসব কূটকৌশল কেবল মানুষের চোখে ভয় সৃষ্টি করার জন্য, এর আসল কোনো শক্তি নেই। আল্লাহ বলেন, “তারা আল্লাহর আলোর শিখা নিভিয়ে দিতে চায় তাদের মুখের ফুঁ দিয়ে; অথচ আল্লাহ তাঁর আলোকে পূর্ণ করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে” (সুরা আস-সাফ: ৮)।
একজন মুমিন যখন আল্লাহর উপর ভরসা রাখে, তখন তার অন্তরে শান্তি নেমে আসে। সে জানে, মানুষের দোষারোপ, অপবাদ, ক্ষুদ্র ষড়যন্ত্র—এসব সবই ধূলিকণার মতো। মানুষের হাতে প্রকৃত কোনো ক্ষমতা নেই, ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই যে আল্লাহর জন্য কাজ করে, তার ব্যর্থ হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। পৃথিবীর মানুষ তাকে হয়তো আঘাত করতে পারে, কিন্তু তার আত্মাকে ভাঙতে পারে না। বরং সেই পরীক্ষাই তার ঈমানকে আরও দৃঢ় করে, আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা আরও উঁচু হয়।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই শিক্ষা আমাদের দৃঢ় মানসিকতা গঠনের পথ দেখায়। মানুষ যদি প্রতিটি কাজে কেবল মানুষের প্রশংসার জন্য কাজ করে, তবে সে খুব দ্রুত হতাশ হয়ে পড়বে। কারণ মানুষের মন একরকম থাকে না, আজ যারা প্রশংসা করছে, কাল তারাই সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু যদি লক্ষ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি, তবে মানুষের প্রশংসা কিংবা সমালোচনা কোনোটিই আর তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বাণী শিক্ষণীয়। যখন একটি জাতি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, আল্লাহর বিধানকে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে, তখন বিশ্বের বড় বড় শক্তির ষড়যন্ত্রও তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ছোট ছোট দল বা জনগোষ্ঠী, যারা আল্লাহর উপর ভরসা করে অটল থেকেছে, তারাই একদিন বিজয়ী হয়েছে। ইসলামের প্রথম যুগের মুসলিমরা তার সর্বোত্তম উদাহরণ। তারা ছিল সামান্য শক্তির অধিকারী, কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা আর ত্যাগের কারণে পৃথিবীর পরাশক্তি তাদের সামনে মাথানত করেছে।
অতএব, সাইয়িদ কুতুব রহিমাহুল্লাহর এই বাণী কেবল ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়, বরং পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি স্তরে একটি মহান শিক্ষা। তা হলো, মানুষের পরিকল্পনা, কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না, যদি আমরা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর জন্য কাজ করি। কারণ মানুষের হাতে কিছুই নেই, সবকিছু আল্লাহর হাতে। আমাদের করণীয় কেবল আল্লাহর প্রতি আন্তরিক থাকা, তাঁর জন্য কাজ করে যাওয়া, এবং মানুষের ভয়ের পরিবর্তে আল্লাহর ভয়কে হৃদয়ে জায়গা দেওয়া।
শেষ পর্যন্ত, প্রকৃত সফলতা মানুষের কাছে নয়, বরং আল্লাহর কাছে। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাজ করা মানুষ পৃথিবীতে একা হলেও আসলে কখনো একা নয়। কারণ আল্লাহ তাঁর সঙ্গেই আছেন।