
মো ইয়াকুব আলী তালুকদার, স্টাফ রিপোর্টার
সিরাজগঞ্জের ঐতিহাসিক বিখ্যাত ঐতিহাসিক মজাদার খাবার ” আবার খাই ” কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এই মজাদার মুখরোচক খাবার। সিরাজগঞ্জের অসংখ্য মানুষের শৈশবের সেই সৃতি বিজরিত আর বহুকাল আগে থেকেই এই “আবার খাই” মজাদার খাবার সকলের কাছে অনেক জনপ্রিয়।
অনেক আগে থেকেই দেখে আসা শিশু কিশোর বয়স্ক সকলের কাছে মজাদার মুখরোচক এই খাবারের নাম মুখে মুখে। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৩ নং বহুলী ইউনিয়নের বহুলী গ্রামের আবার খাই ফেরিওয়ালা এই বৃদ্ধ চাচা নিজের হাতে নিজের বাড়ীতেই তৈরী করে নিয়ে আসেন। আবার খাই, গুলগুলা, খুরমা, নিমকি, এসব বিভিন্ন গ্রামের বাড়ী বাড়ী, পাড়ায় পাড়ায় ফেরী করে বিক্রি করে আসছেন। এলাকার অসংখ্য মানুষ বলেন আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন মা আমাদের কিনে দিতো টাকার বদলে চাউল দিয়ে, ডাউল দিয়ে, ধান দিয়ে, সরিষা দিয়ে। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই টাকার বদলে চাউল দিয়ে এই সদা গুলা নিতো। আবার খাই ফেরিওয়ালা পাতিল ভরে সদায় নিয়ে আসেন আর বাড়ী ফেরেন পাতিল ভর্তি চাউল নিয়ে। উনি কানে কম শুনে, চোখেও একটু কম দেখেন, কিন্তু অনেক জোরে জোরে ডাকা ডাকি করেন। উনার কমন ডায়লগ এই যে আইসো আইসো….! এসে গেছে আবার খাই! একবার খাইলে মন আবার খাইতে চায়! এখুনি আসেন চলে গেলে আফসোস করবেন! আসেন আসেন!
বিভিন্ন মৌসুমে ভরপুর বিক্রি করেন এই মজাদার খাবার। ধান, পাট, গম, সরিষা, কলাই, আখের মৌসুমে মানুষ যখন দিন রাত কাজে ব্যাস্ত, শরীর অনেক ক্লান্ত তখনই তারা একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার খাই ফেরিওয়ালার সন্ধান করেন। গাড়া গ্রামের বিভিন্ন আড্ডা স্থলে আবার খাই মজাদার মুখরোচক খাবারের সমারহ আড্ডাকে করে আরও প্রানবন্ত। আবার খাই ফেরিওয়ালা আসার সাথে সাথে হুমড়ি খেয়ে পড়েন সবাই। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা মজাদার খাবার ক্রয়ের জন্য বাবা-মায়ের কাছে বায়না ধরেন। একটু দেরি হলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি করতে থাকেন যতোক্ষণ না আবার খাই হাতে পায়।
আবার খাই ফেরিওয়ালা বয়সের ভাড়ে শরীর একেবারে দূর্বল ও শরীর শুকিয়ে যাওয়া ফেরিওয়ালা চাচা আসেন খুব সকালে অনেকের ঘুম থেকে ওঠার আগেই । খুব ভোরে বাড়ী থেকে বের হন এই খাবার গুলো বিক্রি করার জন্য। তখন অনেকেই ঘুমে থাকে। কিন্তু উনি আসার পরে উনার ডাকা ডাকিতে যারা ঘুমাই থাকে তাদের ঘুম ভাঙ্গে, বিশেষ করে বাচ্চাদের, ছোট ছোট বাচ্চারা বাড়ী থেকে ছুটে আসে সদায় নেবার জন্য। খেতে ভালোই মজা লাগে। ছোট বাচ্চারা নরম তুলতুলে গুলগুলা, নিমকি, খুরমা খুবই পছন্দ করে। উনি সব আইটেম নিজেই তৈরী করেন। বয়স হয়েছে, বৃদ্ধ হয়েছে, তাও নিজে ব্যবসা করে পরিশ্রম করেন। কারো কাছে হাত পাতেন না। ভাড় কাঁধে করে নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ছোটেন মুখরোচক মজাদার খাবার গুলো ফেরী করে বেড়ান৷
এই বয়সে এসেও উনার জন্য ভাড়ে করে ফেরী করা বেশ কষ্ট সাধ্য ব্যাপার। তারপরও জীবনের তাগিদে লড়াই করে চলেছেন। জীবন সংগ্রামের এক মহা সৈনিক তিনি। হয়তো উনি মারা গেলে আর এমন কেউ আর ফেরি করে মজাদার খাবার নিয়ে আসবে না। হারিয়ে যাবে সিরাজগঞ্জের মজাদার মুখরোচক খাবার আবার খাই! সেই সাথে হারিয়ে যাবে চিরচেনা সবার প্রিয় মুখ আবার খাই ফেরিওয়ালা চাচাও! সিরাজগঞ্জের হাজারো মানুষ আজ কর্ম ব্যাস্ততায় ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করলেও আবার খাই এর কথা আজও মনে পড়ে। গল্প কথায় সিরাজগঞ্জের আবার খাই এর কথা বলে বেড়ান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিত বিভিন্ন জনের কাছে। সিরাজগঞ্জের অসংখ্য মানুষ ভুলে গেলেও আজও ভোলেননি আবার খাই ফেরিওয়ালা। আজও তার কাঁধে আবার খাই বিখ্যাত ঐতিহাসিক মুখরোচক মজাদার খাবার নিয়ে ঘুরে বেড়ান তিনি।