
মো ইয়াকুব আলী তালুকদার
স্টাফ রিপোর্টার
অপরাধের হিসাব গণনা করে রাখা যায়, কিন্তু অপরাধীর বিচার করা যায় না, এটাই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সত্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ধারা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকভাবে অব্যাহত রয়েছে এবং এই সত্যটি সবচেয়ে বেশি নির্লজ্জভাবে যে রাষ্ট্র প্রমাণ করে চলেছে, তার নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক রিপোর্টের হিসেবে অ্যামেরিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পঞ্চাশটিরও বেশি দেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করেছে। ভিয়েতনামে তিরিশ লাখ মানুষের মৃত্যু, ইরাকে পনেরো লাখের বেশি বেসামরিক প্রাণহানি, আফগানিস্তানে বিশ বছরের অর্থহীন যুদ্ধে লক্ষাধিক মানুষের জীবন ধ্বংস, লিবিয়াকে একটি কার্যকর রাষ্ট্র থেকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা, ইয়েমেনে গণহত্যায় সহায়তা, এবং সর্বশেষ গাজায় একটি সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যে নৃশংসতা চলছে তাতে সরাসরি সমর্থন ও অস্ত্র সরবরাহ, এই সব কিছুর হিসাব যদি একসাথে করতে বসেন, আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। আর এটাই কিন্তু পরিকল্পনার অংশ।
এখানে একটু থামুন এবং গভীরভাবে ভাবুন।
এত বেশি অপরাধ তারা করেছে যে মানুষ হিসাব রাখতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এত বেশি মিথ্যা বলে যে মানুষ সত্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে হাল ছেড়ে দেয়। অপরাধের মাত্রা এত ভয়াবহ করে তোলো যে সুস্থ বিবেকের মানুষ সেটা নিয়ে কথা বলার মানসিক শক্তিই হারিয়ে ফেলে। এটি কোনো আবেগের কথা নয়, এটি একটি সুপরীক্ষিত এবং কার্যকর কৌশল যাকে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে “atrocity fatigue” বা নৃশংসতার ক্লান্তি বলা হয়। অ্যামেরিকা এই কৌশলটি কেবল বোঝেনি, সে এটিকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ করে নিয়েছে।
আর এই কৌশলে অ্যামেরিকা একা নয়। ইজরায়েল, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, মোটা দাগে যাকে আমরা পশ্চিমা অক্ষ বলি, তাদের সকলের কমন পদ্ধতি এটি। তবে অ্যামেরিকা এবং ইজরায়েল এই শিল্পকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছে যা বাকিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সবার চেয়ে উচ্চে।
এবার আসুন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। অ্যামেরিকা কি জানে না তার অপরাধের পরিমাণ কতটা ভয়াবহ? অবশ্যই জানে। পরিষ্কারভাবে জানে। পেন্টাগনের গোপন নথি ফাঁস হয়েছে, উইকিলিকস লক্ষাধিক দলিল প্রকাশ করেছে, কংগ্রেসের ভেতর থেকে সিআইএর নির্যাতনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, স্বয়ং অ্যামেরিকান সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা এই সত্য বারবার উচ্চারণ করেছেন। তবু বিচার হয় না। কারণ এই ব্যবস্থাটি বিচারের জন্য তৈরি হয়নি, বিচার এড়ানোর জন্য তৈরি হয়েছে।
কাগজে কলমে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আছে, জাতিসংঘের সনদ আছে, মানবাধিকার আইন আছে। কিন্তু বাস্তবে? অ্যামেরিকা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্যই নয়। ২০০২ সালে আমেরিকান সার্ভিস মেম্বারস প্রটেকশন অ্যাক্ট পাস হয়েছে, যে আইন অনুযায়ী অ্যামেরিকা প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে নিজের নাগরিকদের আন্তর্জাতিক বিচার থেকে রক্ষা করতে পারবে। এই আইনটির অনানুষ্ঠানিক নাম “হেগ ইনভেশন অ্যাক্ট”। অর্থাৎ আইনকে এভাবেই গড়া হয়েছে যেন অপরাধীকে সুরক্ষা দেওয়া যায়। এটি আইনের ব্যর্থতা নয়, এটি আইনের উদ্দেশ্য।
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা জানি যে জুলুম কখনো চিরস্থায়ী হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, জালেমরা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহকে কখনো গাফেল মনে করো না। কিন্তু এই বিশ্বাসকে আমরা যদি নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত বানাই, তবে আমরা নিজেরাই এই জুলুমের অংশীদার হয়ে যাই। ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম উম্মাহ যখনই বিদেশি আধিপত্যের প্রতি মুগ্ধতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, তখনই সে পরাজিত ও পরাধীন হয়েছে। আন্দালুসের পতন হোক, অটোমান খিলাফতের পতন হোক বা ঔপনিবেশিক যুগের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের পরাধীনতা হোক, প্রতিটি ক্ষেত্রে এই মুগ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আজকের বাস্তবতায় অ্যামেরিকা মুগ্ধতা ঠিক সেই মাদকের মতো যা ধীরে ধীরে কাউকে মেরে ফেলে, কিন্তু মরার আগ পর্যন্ত সে বুঝতেই পারে না সে মরছে। মাদক একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে, পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিন্তু অ্যামেরিকা মুগ্ধতা একটি পুরো প্রজন্মের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। তাদের শেখায় যে শক্তিশালীর কাছে মাথা নত করাই বাস্তববাদিতা। তাদের বোঝায় যে আমেরিকার আধিপত্যকে প্রশ্ন করা মানেই সভ্যতাবিরোধী হওয়া। তাদের দাস বানায়, তবে এমনভাবে যে দাসরা নিজেরাই তাদের শৃঙ্খলকে স্বাধীনতা মনে করে।
এই মুগ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসার মানে আমেরিকাকে ঘৃণা করা নয়। এর মানে হলো চোখ খুলে দেখা। সত্যিকারের মানবাধিকার, সত্যিকারের ন্যায়বিচার, সত্যিকারের সভ্যতা কোনো একটি রাষ্ট্রের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। যে রাষ্ট্র একই সাথে মানবাধিকারের বক্তৃতা দেয় এবং গণহত্যায় অস্ত্র সরবরাহ করে, সে রাষ্ট্রের প্রতি মুগ্ধতা বিবেকের দেউলিয়াত্ব ছাড়া আর কিছু নয়।
আজ আপনি এই মুগ্ধতার খোলস থেকে বেরিয়ে আসুন। আগামীকাল আপনার সন্তান সমতার ভাষায় কথা বলতে শিখবে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখবে এবং ন্যায়ের পক্ষে সাক্ষী হতে শিখবে। দেরি হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু হয়তো এখনো খুব বেশি দেরি হয়নি। নয়তো যুগের পরে যুগ, শত বছর, হাজার বছর প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ভাবে নিষ্পেষিত হতেই থাকবে।