
মো ইয়াকুব আলী তালুকদার, স্টাফ রিপোর্টার
যে জাতি মৃত্যুকে কখনো ভয় পায় না, তাকে কেউ কখনো পরাজিত করতে পারেনি। তার অসংখ্য প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় ভূরি ভূরি আছে!
ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন কিছু জাতির সন্ধান মেলে, যাদের শরীর জয় করা গেলেও আত্মাকে কখনো নোয়ানো যায়নি। ইরানি জাতি তাদের মধ্যে অন্যতম। আলেকজান্ডার এসেছিলেন, চেঙ্গিস খান এসেছিলেন, তৈমুর লং এসেছিলেন, নাদির শাহ এসেছিলেন। প্রত্যেকে ইরানকে পদানত করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই ইরানি সভ্যতা, সংস্কৃতি আর চেতনার কাছে কোনো না কোনোভাবে আত্মসমর্পণ করে গেছেন। বিজয়ীরা বিজিত হয়ে গেছেন।
এই মানসিকতা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এটি হাজার বছরের আগুনে পোড়া একটি জাতির স্বভাবে পরিণত হয়েছে।
১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল, ইরানের ইতিহাসে এই সময়টি সাংবিধানিক বিপ্লবের সময় নামে পরিচিত। সেসময় ইরানের সাধারণ মানুষ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে, বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল একটি সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ কতটা কঠিন ছিল, তা বোঝা যায় তাবরিজের ঘটনায়।
১৯১১ সালের দিকে রাশিয়া তাবরিজ শহর অবরোধ করে বসে। বাইরে থেকে কোনো সাহায্য আসছে না, ভেতরে খাবার নেই, অস্ত্র নেই, শক্তি নেই। শহরের পুরুষেরা একসময় হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। মনে হয়েছিল, এবার বোধহয় আর সম্ভব নয়।
কিন্তু সেই রাতে তাবরিজের নারীরা ইতিহাস লিখলেন। একদিন রাতে শহরের বহু নারী তাদের ঘুমন্ত স্বামীদের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে জাগিয়ে তুললেন। বললেন, হয় লড়াই করো, নয়তো এই ঘর তোমার জন্য নয়। এই দৃশ্য কোনো চলচ্চিত্রের কল্পনা নয়, এটি সত্যিকারের ইতিহাস। এরপর সেই পুরুষেরা আবার অস্ত্র তুলে নিলেন। খাবার না থাকায় ঘাস আর লবঙ্গ খেয়ে তারা রাশান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেলেন।
এই ঘটনাটি শুধু একটি যুদ্ধের গল্প নয়। এটি একটি জাতির চরিত্রের দলিল। এই মনোবলের একটি গভীর ভিত্তি আছে। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, যে জাতি নিজেকে পরিবর্তন না করে, আল্লাহ তাদের অবস্থা পরিবর্তন করেন না। তাবরিজের নারীরা সেই পরিবর্তনটি নিজেরাই ঘটিয়েছিলেন। তারা শুধু তাদের স্বামীদের জাগাননি, একটি জাতির সম্মানবোধকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। ইসলামে নারীকে কখনো দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় ভাবা হয়নি। বরং উম্মুল মুমিনীন থেকে শুরু করে ইতিহাসের পাতায় পাতায় মুসলিম নারীর সাহস ও ত্যাগের অগণিত উদাহরণ আছে।
একটি মানুষ বা একটি জাতি সবচেয়ে শক্তিশালী হয় তখন, যখন সে হারানোর ভয়ের চেয়ে বড় কিছু রক্ষার অনুপ্রেরণা খুঁজে পায়। তাবরিজের মানুষেরা জানতেন তারা কী রক্ষা করছেন, তাদের মাটি, তাদের মর্যাদা, তাদের পরিচয়। এই অনুভূতি যে জাতির মধ্যে জীবন্ত থাকে, তাকে বাইরের কোনো শক্তি স্থায়ীভাবে দমন করতে পারে না।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, একটি দেশের সত্যিকারের শক্তি তার সেনাবাহিনীতে নয়, তার সাধারণ মানুষের মানসিকতায়। যে সমাজে একজন সাধারণ গৃহবধূও দেশের প্রয়োজনে পিস্তল হাতে নিতে পিছপা হন না, সে সমাজকে কোনো সাম্রাজ্য দীর্ঘমেয়াদে শৃঙ্খলিত রাখতে পারে না।
পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রে যে ইরানিকে আপনি দেখেন, তাকে দেখে পুরো জাতিকে বিচার করবেন না। মাতৃভূমিতে থাকা মানুষগুলো আলাদা। তারা এখনো সেই মাটির সন্তান, যে মাটি হাজার বছর ধরে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়েছে এবং টিকে থেকেছে।
ইতিহাস সাক্ষী, যারা পরাজয় মেনে নেয় না, তাদের শেষ পর্যন্ত হারানো যায় না।