
সুমন চন্দ্র দে, মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপ বর্তমানে ভয়াবহ পরিবেশগত হুমকির মুখে পড়েছে। দ্বীপটিতে সম্প্রতি বেআইনিভাবে ঝাউগাছ কেটে পর্যটকদের জন্য কটেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্বীপের অভ্যন্তরে গড়ে উঠছে ‘মহিষের খামার’—যার প্রভাব পড়ছে দ্বীপের মাটি, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের।
অপরূপ সৌন্দর্যের সোনাদিয়া দ্বীপ কক্সবাজার শহর থেকে ৭ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমের দূরে সাগর গর্ভে অবস্থিত। এটি মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের একটি অংশ। প্রায় নয় বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটিতে তিন দিকে সমুদ্র সৈকত, সাগর লতায় ঢাকা বালিয়াড়ি, রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় বনভূমি, সাগরের নীল পানি, কেয়া বন, লাল কাঁকড়া, বিভিন্ন পশুপাখি ও কাছিমের ডিম পাড়ার স্থান সহ বিভিন্ন বিলুপ্ত প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের আবাস। এছাড়াও দৃষ্টি নন্দন ঝাউবন দেখতে দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমণে আসেন পর্যটকরা।
এই দ্বীপের বালিয়াড়ির পাশে অবস্থিত প্রাকৃতিক ঝাউবনে গাছ কেটে স্থানীয় প্রভাবশালী ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে আতাত করে মহিষের খামার ও কটেজ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, দ্বীপের পূর্বাঞ্চলে দেখা গেছে মহিষ চারণের প্রবণতা। এদের জন্য পরিষ্কার করা হচ্ছে বন ও ঘাসের জমি। এই ‘মহিষের খামার’ ধীরে ধীরে দ্বীপের ভেতরের মাটি ক্ষয় করছে এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষিকাজ ও উদ্ভিদ জগতের জন্য মারাত্মক হুমকি।
স্থানীয়রা বলছেন, সম্প্রতি একটি প্রভাবশালী চক্র শত-শত ঝাউগাছ কেটে সেখানে কটেজ নির্মাণ শুরু করেছে। এতে করে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও মহিষের অভয়ারণ্য হিসেবে প্রাকৃতিক উদ্ভিদ বিনষ্ট করে মহিষের বিচরণ ক্ষেত্র ও খামার তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে বহু পাখি ও বন্যপ্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ঝাউগাছ উপকূলীয় এলাকায় ভূমিক্ষয় রোধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের নির্মাণ কাজ শুধু পরিবেশ বিপন্ন করছে না, বরং পর্যটন এলাকার ভারসাম্যও নষ্ট করছে। এতে করে দ্বীপ রক্ষার ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা আব্দুস সোবহান বলেন, “প্রতিদিনই অল্প অল্প করে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। আমাদের কোন কথা কেউ শুনছে না।” তিনি প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করন।
এদিকে স্থানীয় সুত্রে আরো জানা গেছে- সম্প্রতি সময়ে সোনাদিয়া দ্বীপে কটেজ নির্মাণের তালিকায় রয়েছে পরিবেশ কর্মীরা। তারা প্রতিনিয়ত সোনাদিয়ার পরিবেশ নিয়ে দীঘির পাড়ে গলা পাটায় আবার রাতের আধারে ঝাউবন নিধন করে কটেজ নির্মাণ করে যাচ্ছে।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হেদায়েত উল্লাহ বলেন- বিষয়টি নজরে এসেছে এবং বন বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সোনাদিয়া দ্বীপ শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি একটি জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ও অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে দ্বীপের অস্তিত্বই হুমকিতে পড়বে। এখনই সময়, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
এ ঘটনায় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত গাছ কাটার কাজ বন্ধ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে।