
সুমন চন্দ্র দে, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি:
প্রকৃতির বিরুপ প্রভাব কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে কক্সবাজারের মহেশখালীর বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ। গত ৭ ও ৮ এপ্রিল ভোররাতে টানা দুই দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে উৎপাদিত ও উৎপাদনাধীন বিপুল পরিমাণ লবণ পানিতে মিশে যাওয়ায় প্রান্তিক চাষিদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এতে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার কুতুবজোম, বড় মহেশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, চাষিরা হতাশ দৃষ্টিতে প্লাস্টিকে মোড়ানো লবণ মাঠের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাতের বৃষ্টিতে জমাট বাঁধা ‘সাদা সোনা’ খ্যাত লবণ গলে পানিতে মিশে গেছে। এছাড়া লবণ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড’ বা কাই নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে অন্তত টানা রোদে ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
বড় মহেশখালীর হারিঘোনা এলাকার চাষি আনচার উল্লাহ বলেন, “মৌসুমের শেষ সময়ে লাভের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছিলাম। কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে কয়েকশ’ মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে। এখন আবার নতুন করে মাঠ প্রস্তুত করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।” একইভাবে কুতুবজোম ঘটিভাঙ্গা এলাকার চাষি গিয়াসউদ্দিন জানান, “বাজারে লবণের দাম এমনিতেই কম। তার ওপর এই ঝড়ে সব শেষ হয়ে গেছে। ঋণ করে মাঠ নিয়েছি, এখন তা শোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ মৌসুমে দেশে প্রায় ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণের চাহিদা রয়েছে। এ লক্ষ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকায় প্রায় ৬৯ হাজার একর জমিতে ৪১ হাজারের বেশি চাষি লবণ উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন।
মহেশখালীতে চলতি মৌসুমে প্রায় ১৭ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হচ্ছে, যা থেকে অনুকূল আবহাওয়ায় গড়ে ২.৫ থেকে ৩.৫ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়। দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশই আসে এই অঞ্চল থেকে। বিসিক কক্সবাজার কার্যালয়ের (লবণ শিল্প উন্নয়ন) উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কয়েক হাজার একর লবণ মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লোনা পানি মিষ্টি হয়ে যাওয়ায় পুনরায় উৎপাদন শুরু করতে চাষিদের অতিরিক্ত শ্রম ও জ্বালানি ব্যয় করতে হবে। এতে জাতীয় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চাষিরা জানান, যেখানে প্রতি মণ লবণের উৎপাদন খরচ ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা, সেখানে বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা আগেই লোকসানে ছিলেন। এর মধ্যে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে মাঠ ইজারা নেওয়ায় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও প্রণোদনা দেওয়ার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।