সুমন চন্দ্র দে, মহেশখালী (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
মহেশখালীর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকায় কর্মরত দুজন ঠিকাদারের খননযন্ত্র ও ট্রাক্টর পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বেড়িবাঁধ এলাকা ও বালিয়াড়ি থেকে অবৈধভাবে বালি তোলার অভিযোগ ওঠে।
গত ২২ জানুয়ারী (বুধবার) দিবাগত রাত তিনটার দিকে উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের নাছির মোহাম্মদ ডেইল এলাকার পশ্চিমে সাগরপাড়ে খননযন্ত্র ও ট্রাক্টর পুড়িয়ে দেয়ার এ ঘটনা ঘটে। এ সময় দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত তিনটি খননযন্ত্র ও মাটি বহনের কাজে ব্যবহৃত চারটি ট্রাক্টর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বালুভর্তি করার জন্য আনা অন্তত চার হাজার জিও ব্যাগ লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। পাশাপাশি দুর্বৃত্তরা মারধর করে ছয়জন পাহারাদারের কাছ থেকে ছয়টি মুঠোফোনের সেট ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষের একটি অফিস ও একটি টাওয়ার নির্মাণের জন্য দুই মাস আগে কাজ পায় তাজ এন্টারপ্রাইজ ও জাহানারা ট্রেডার্স নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাজ এন্টারপ্রাইজের পাহারাদার নুর হোসাইন বলেন, প্রতিদিনের মতো গতকাল রাতে তিনিসহ তাঁর পাঁচ সহকর্মী বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্মাণকাজে পাহারা দিচ্ছিলেন। স্থানীয় চেয়ারম্যান বাচ্চুর কিছু লোক দীর্ঘ দিন থেকে ঠিকাদার এর নিকট চাদাঁ দাবী করে আসছিল। গতকাল দুপুরে একদল লোক এসে হুমকী দিয়ে যায় আর রাতেই আগুন ধরিয়ে দেয়। চেয়ারম্যান বাচ্চুর লোকজন পরিকল্পিতভাবে এমন কাজটি করেছে বলে জানিয়েছে গাড়ীর মালিক।

এর মধ্যে দিবাগত রাত তিনটার দিকে একদল মুখোশধারী দুর্বৃত্ত ঠিকাদারের পাহারাদারদের ওপর হামলা চালায়। একপর্যায়ে তারা মারধর করে তাঁদের কাছ থেকে ছয়জনের মুঠোফোন সেট নিয়ে যায়। এ সময় তারা জ্বালানি তেল ঢেলে খননযন্ত্র ও ট্রাক্টরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া দুর্বৃত্তরা যাওয়ার সময় অন্তত চার হাজার খালি জিও ব্যাগ লুট করে নিয়ে যায়।
এর আগে গতকাল দুপুরে ধলঘাটের শরইতলী এলাকার বেড়িবাঁধ ও বালিয়াড়ি থেকে বালি তুলে পাচারের অভিযোগ ওঠে ইউনিয়নটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আতাহার ইকবাল দাদুল ও ইউপি সদস্য তাজ এন্টারপ্রাইজের সহকারী ঠিকাদার জমির উদ্দিনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এই বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে আতহার ইকবাল দাদুল বলেন, বন্দরের কাজের জন্য ডাইক তৈরি করতে সাগরের বালিয়াড়ি থেকে বালি তোলা হয়েছে। এতে বুধবার বিকালে স্থানীয়রা বাঁধা দিলে বালি তোলা বন্ধ রাখে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় ইউপি সদস্য জমির উদ্দিনের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে, তিনি বালি তোলার কথা স্বীকার করেন এবং এতে উপজেলা প্রশাসনের কারো অনুমতি নেই বলে জানান। তিনি আরো বলেন, দুই মাস ধরে পাঁচটি খননযন্ত্র ও ছয়টি পাওয়ার ট্রাক্টর দিয়ে মাতারবাড়ি বন্দর কর্তৃপক্ষের অফিসের জন্য ডাইক (বাঁধ) ও টাওয়ার নির্মাণের কাজ চলছে। ডাইকের পাশে বসানো হচ্ছে জিও ব্যাগ ও ব্লক। কিন্তু নির্মাণকাজের শুরু থেকে স্থানীয় ধলঘাট ইউপি চেয়ারম্যান আহসান উল্লাহসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী লোকজন নানাভাবে কাজে বাঁধা ও হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এই ঘটনার পেছনে তাঁদের হাত থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে স্থানীয়দের ধারণা, বালি তুলে পাচারের অভিযোগ ঢাকতে পরিকল্পিতভাবে খননযন্ত্রে এই আগুন দেয়া হয়েছে। স্থানীয়রা আরো জানান, ব্যবসায়িক পায়দা লুটতে বেড়িবাঁধের পাশ থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে বন্দরের কাজ করে আসছিলেন ধলঘাটা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আতাহার ইকবাল দাদুল ও ইউপি সদস্য জমির মেম্বার সিন্ডিকেট। তাদের কারণে ধলঘাটার বেড়িবাঁধ হুমকির মুখে পড়তেছে। এনিয়ে স্থানীয়রা বাঁধা দিয়েছিলেন এবং প্রশাসনকে অবগত করেছিলেন। ওয়াপদার লোকজন এসে অবৈধ বালি উত্তোলন কার্যক্রম নিষেধ করেন বলে জানা যায়। এঘটনার পর একটি মহল পরিকল্পিত ভাবে গাড়ি পুড়িয়ে স্থানীয়দের ও তাদের প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে
খবর পেয়ে ২৩ জানুয়ারী (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টার দিকে একদল পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান মহেশখালীর মাতারবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত উপপরিদর্শক রাইটন দেব। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে রাইটন দেব বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি আগুন দিয়ে দুর্বৃত্তরা তিনটি খননযন্ত্র ও তিনটি ট্রাক্টর পুড়িয়ে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, তারা পাহারাদারদের মারধরও করেছে। এই ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা বের করার চেষ্টা চলছে।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কাইছার হামিদ বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা বের করার চেষ্টা চলছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবী স্থানীয়দের।