মো ইয়াকুব আলী তালুকদার
স্বাধীনতার পূর্ব থেকে এবং স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশ ও দেশের আপামর জনসাধারণের স্বাধীনতা বা মুক্তি আজও মেলেনি। ৫২, ৭১, ২৪ এর পরে এসেও বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা আর নতুন করে ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। এই দেশ কাগজে-কলমে স্বাধীন, কিন্তু বাস্তবে জনগণ বন্দি, পরাধীন। পতাকা আছে, সংবিধান আছে, নির্বাচন আছে—কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নেই। অধিকার চাইতে গেলেই মানুষকে ফিরতে হচ্ছে লাশ হয়ে।
এই রকম ঘটনা বা দৃশ্য কোনো হঠাৎ বিপর্যয় নয়, এটি একটি ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ফলাফল। জনগণ আগে যেমন অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, আজও তেমনি বঞ্চিত—বরং এখন সেই বঞ্চনা আরও নিষ্ঠুর, আরও রক্তমাখা, অনেক করুন, অনেক নিদারুণ। তখন নিপীড়ন ছিল নীরব, এখন তা প্রকাশ্যে, দিবালোকে,ঘোষণা কৃত, নির্দ্বিধায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রছায়ায়। সেখানে রাস্ট্রের কোন দায়বদ্ধতা নেই।
বারবার স্বৈরাচারী শাসনের হাত থেকে মুক্তির জন্য প্রতিবাদী মানুষ গুলো সংগ্রাম করে গেছে, অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, সম্পদ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় জনমুক্তির আশায় ছাত্র-জনতা যে রক্ত ঢেলেছিল, সেই রক্তের উপর দাঁড়িয়েই ক্ষমতার চেয়ারে বসানো হয়েছিল একজন শিক্ষককে। আশা ছিল—একজন শিক্ষিত, সচেতন নাগরিক রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে রাজনীতি মানবিক হবে। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ার প্রমাণ করল, এটি কেবল মানুষ বদলায় না—মানুষকে গ্রাস করে।
ত্যাগী এই জাতির রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় বসে, সেই রক্তের সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা—এটাই আজকের রাজনীতির নগ্ন বাস্তবতা। ভাইয়ের রক্তের দাবি নিয়ে কেউ বিচার চাইলে রাষ্ট্র বলে—লাশ নিয়ে যাও। আর যদি প্রতিবাদ না থামে , তবে গুলি, পুনরায় আবারও লাশ। এরপর রাষ্ট্রযন্ত্র নির্লজ্জভাবে অস্বীকার করে—“আমরা কিছুই করিনি।” এই অস্বীকারই আজ রাষ্ট্রের সবচেয়ে নিয়মিত অতি সাধারণ ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অধিকাংশ প্রতিনিধির আচরণ ক্ষমতা পাওয়ার আগে সুন্দর, ভালো নীতি আদর্শ থাকে, ক্ষমতা পাওয়ার পর দায়িত্ব হারিয়ে যায়, ভূলে যায় পূর্বের সকল প্রতিশ্রুতির কথা, ভূলে যায় সকল দায়িত্ব, সকল নীতি আদর্শের কথা। কমিটি গঠনের আগে ও পরে একই মুখ থাকলেও, একই বিবেক আর থাকে না। নেতৃত্ব বদলায় না, বদলে যায় মানুষের মূল্য। শুধু নেতৃত্ব ও ক্ষমতার হয় হাত বদল। যেই দল ক্ষমতাসীন হয় তখন বিরোধী দল ও মত চরম শত্রুতে পরিণত হয়। কঠোর হস্তে তাদের দমন-পীড়ন করা হয়। আবার বিরোধী দল যখন ক্ষমতায় যায় বাস্তবতা পূর্বের ক্ষমতাসীন দলের আচরণে রুপ নেয়। মাঝখানে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হয়। তখন দেশের নাগরিক আর মানুষ থাকে না—সে হয়ে ওঠে শুধু সংখ্যা, বোঝা, অথবা টার্গেট বা অধীনস্থ দাস।
সেরকম-ই চিত্র গতকাল দেখা গেল, ইনকিলাব মঞ্চের হাদী হত্যার বিচার চাওয়া হলো। জবাব এলো গুলিতে, লাঠিচার্জে, বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেট, টিয়ার সেল, কাঁদানেগ্যাসে, পুরনো সৈরাচারী আক্রমনাত্মক আচরণ ও ভাষায় । ছাত্রদের ওপর পুলিশ বাহিনী চালাল নির্মম লাঠিচার্জ। সংবাদকর্মীকে টার্গেট করে মারধর করা হলো, কারণ সে সত্য দেখাতে চেয়েছিল। সত্য এখন অপরাধ, আর সত্য বলাই রাষ্ট্রদ্রোহ।
স্বাধীন এই রাষ্ট্রে গুলি এখন শুধু প্রতিবাদকারীর শরীরে ঢোকে না—এটি সমাজের বিবেককেও ক্ষতবিক্ষত করে। লাঠি শুধু পিঠে পড়ে না—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কণ্ঠও ভেঙে দেয়, স্তব্ধ করে দেয়, বন্ধ করে দিতে চায়। আর রাষ্ট্র যখন বলে “আমরা জানি না”—তখন সেই না-জানাই সবচেয়ে ভয়ংকর প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনীতি নয়, রাজনীতি নয়—সবচেয়ে বড় সংকট হলো নৈতিকতা। রাষ্ট্র নাগরিককে শত্রু ভাবছে, আর নাগরিক রাষ্ট্রকে ভয় পাচ্ছে। এই সম্পর্ক কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
ইতিহাস একদিন প্রশ্ন করবে—যখন গুলি চলছিল, তখন রাষ্ট্র কাদের পক্ষে ছিল? আর যখন মানুষ পড়ে যাচ্ছিল রক্তাক্ত হয়ে, তখন ক্ষমতা কাদের রক্ষা করছিল?
এই সকল প্রশ্নের জবাব না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ কেবল একটি নামমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্রই থেকে যাবে—যেখানে স্বাধীনতা স্মৃতিতে আছে, বাস্তবে নয়। এখান থেকে আদৌ কি জনগণের মুক্তি মিলবে? স্বাধীনতার স্বাদ কি উপভোগ করতে পারবে? নাকি এভাবেই মানুষের জীবন কাটবে যুগের পরে যুগ।