
বেবি চক্রবর্ত্তী:- ভাগীরথীর স্রোতে স্নিগ্ধ মলিনতায় ইতিহাসের রূদ্ধশ্বাস।পলাশীর প্রান্তর থেকে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা— সবকিছুর নীরব সাক্ষী আজ দাঁড়িয়ে আছে নিজামত কিলা চত্বরে।
একসময় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার হিরাঝিল প্রাসাদ আজ গঙ্গার গর্ভে বিলীন হলেও, মুর্শিদাবাদের বুক চিরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘বড়ো কুঠি’। পর্যটকদের কাছে যা হাজারদুয়ারি নামেই সমধিক পরিচিত। ইউরোপীয় স্থাপত্য আর নবাবি মেজাজের এক অপূর্ব মেলবন্ধন এই প্রাসাদ। প্রতি বছর কয়েক লক্ষ মানুষ ভিড় জমান ১০০০ দরজার এই রহস্যপুরীতে। যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বাংলার উত্থান-পতন আর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। মুর্শিদাবাদের এই গৌরবময় ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের হাত ধরে। তৎকালীন সুবাহ বাংলার দেওয়ান ছিলেন করতলব খাঁ। তাঁর কর্মদক্ষতা আর সততায় মুগ্ধ হয়ে সম্রাট তাঁকে ‘মুর্শিদকুলি খাঁ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মকসুদাবাদ থেকে রাজধানী সরানোর অনুমতি পাওয়ার পর সেই শহরের নাম বদলে রাখা হয় মুর্শিদাবাদ। ১৭১৭ সালে ঢাকা থেকে পাকাপাকিভাবে মুর্শিদাবাদে বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী সরিয়ে আনেন তিনি। দিল্লির মুঘল শক্তি যখন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে, তখন মুর্শিদকুলি খাঁ কার্যত স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন শুরু করেন। তিনিই ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব। এর পর ভাগীরথী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। সুজাউদ্দিন থেকে আলিবর্দি খাঁ— নবাবি মসনদ দেখেছে বহু পালাবদল। কিন্তু ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পরাজয় বাংলার কপালে ব্রিটিশ শাসনের তিলক পরিয়ে দেয়। মিরজাফর আর মিরকাশিমের হাত ঘুরে ক্ষমতা চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে।অনেকের মনে এক গভীর ভুল ধারণা রয়েছে যে, এই বিশাল হাজারদুয়ারি প্রাসাদ বুঝি সিরাজ-উদ-দৌলাই তৈরি করেছিলেন। আদতে তা নয়।
একসময় সিরাজের আবাস ছিল হিরাঝিল প্রাসাদে। আজকের হাজারদুয়ারি তৈরি হয়েছিল অনেক পরে। নবাব নাজিম হুমায়ুন জা ১৮২৯ সালে এই প্রাসাদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। স্থপতি ডানকান ম্যাকলিওডের নকশায় তৈরি এই স্থাপত্যে পুরোপুরি ইউরোপীয় ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে ইতালীয় রীতির সৌধগুলোর সঙ্গে এর গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। প্রায় আট বছরের শ্রমের পর ১৮৩৭ সালে শেষ হয় এই নির্মাণকাজ। হুমায়ুন জা নিজে একে ‘বড়ো কুঠি’ বলতেন। প্রায় ৪১ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল ইমারতটি আজও পর্যটকদের বিস্মিত করে।এই প্রাসাদের নামকরণ নিয়ে রয়েছে এক চমকপ্রদ তথ্য। এখানে মোট ১ হাজারটি দরজা রয়েছে বলেই এর নাম হাজারদুয়ারি। তবে মজার বিষয় হল এই হাজার দরজার মধ্যে ১০০টি দরজাই নকল। দেয়ালের গায়ে এমন নিখুঁত নকশা করে দরজাগুলো বসানো হয়েছে যে খালি চোখে দেখে তা বোঝার উপায় নেই। মূলত শত্রুপক্ষকে বিভ্রান্ত করতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। প্রাসাদের ভেতর পর্যটকদের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই এক রাজকীয় আবহ গ্রাস করে। বর্তমান সময়ে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের অধীনে এখানে একটি সমৃদ্ধ জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে ঠাঁই পেয়েছে নবাব, অভিজাত এবং ব্রিটিশদের ব্যবহৃত মূল্যবান সরঞ্জাম।
জাদুঘরের অন্দরে পা রাখলেই চোখে পড়বে ইতিহাসের দুর্মূল্য কিছু সম্পদ। আসবাবপত্র থেকে শুরু করে সেই সময়ের শৌখিন বাসনপত্র— সবই যেন জীবন্ত। রয়েছে বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা তৈলচিত্র। ইতিহাসের গবেষকদের জন্য এখানে রয়েছে নবাবি আমলের দুষ্প্রাপ্য বই ও পুঁথিপত্র। যার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো ‘আইন-ই-আকবরি’-র পাণ্ডুলিপি এবং স্বর্ণমণ্ডিত পবিত্র কোরান শরিফ। তবে দর্শকদের সবচেয়ে বেশি টানে অস্ত্রাগার। প্রায় ২ হাজারেরও বেশি অস্ত্রের বিশাল সম্ভার রয়েছে এখানে। যার মধ্যে আছে পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত মারণাস্ত্র। এমনকি সেই ছুরিটিও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে, যা দিয়ে মহম্মদি বেগ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যা করেছিলেন। আলিবর্দি খাঁ এবং সিরাজের তলোয়ার দেখে আজও শিউরে ওঠেন ইতিহাসপ্রেমীরা।
কিলা নিজামত বা নিজামত কিলা চত্বরের গুরুত্ব কেবল হাজারদুয়ারিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এই চত্বরের ভেতরেই অবস্থান করছে ইমামবাড়া, ঘড়ি ঘর, মদিনা মসজিদ এবং চক মসজিদের মতো চোখধাঁধানো সব স্থাপত্য। প্রতিটি ইটের ভাঁজে লুকিয়ে আছে রাজশক্তি হারানোর আর ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার হাজারো গল্প। রাজধানী মুর্শিদাবাদ বহু পরিবর্তনের সাক্ষী। ব্রিটিশদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকে যে রাজনৈতিক ডামাডোল শুরু হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শহর। সেই স্মৃতি আজও বয়ে চলছে গঙ্গার পারের এই প্রাসাদ।
সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য এই জাদুঘর খোলা থাকে। তবে প্রতি শুক্রবার এটি বন্ধ রাখা হয়। ইতিহাস প্রিয় মানুষের কাছে মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যায় যদি না হাজারদুয়ারির অলিন্দে দাঁড়িয়ে একবার ভাগীরথীর হাওয়ার স্বাদ নেওয়া হয়। নবাবদের সেই ঐশ্বর্য আজ আর নেই, কিন্তু তাঁদের ফেলে যাওয়া স্থাপত্য আজও চিৎকার করে বলে ওঠে— ’নবাবি ইতিহাস কথা বলে হাজারদুয়ারি প্রাসাদে’ পুরানো ফাইল চিত্রগুলি যেন জীবন্ত কিংবদন্তী মুর্শিদাবাদের ইতিহাস।