
তাওহীদ হাসান পিয়াল -খুকৃবি প্রতিনিধি
বাংলাদেশে প্রতি বছরের এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে বন্যা ও জলাবদ্ধতা, যেখানে একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে তীব্র জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি এবং উজানের পানির সম্মিলিত প্রভাবে প্রতি বছরই নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো পরিবার, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা আর অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব গিয়ে দাঁড়াচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে বন্যাকবলিত হয়ে চরম সংকটে পড়েছেন এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনাগুলো এখন অনেক বেশি ঘন ঘন ঘটছে ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে। এই বহুমাত্রিক সংকটের পেছনের মূল কারণ এবং এর জন্য আসলে কে দায়ী—প্রতিবেশী রাষ্ট্র, সরকার, কর্মকর্তা নাকি আমরা সাধারণ নাগরিকরা নিজেরাই,
সেই প্রশ্নটি তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি সুদীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ মতামত প্রকাশ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিএইচডি গবেষক এবং খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোঃ নাজমুল হক। তাঁর এই বিশ্লেষণধর্মী পোস্টটিতে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে এত বড় একটি সমস্যার জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করলে এর স্থায়ী ও টেকসই সমাধান কখনোই আসবে না।
গবেষক মোঃ নাজমুল হকের ফেসবুক পোস্টে সরকারি প্রকল্প ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে, যেখানে তিনি উন্নয়ন প্রকল্প এবং সেগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সরকার প্রতিবছর নদীর বাঁধ নির্মাণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও বিপুল ব্যয়ে নির্মিত অনেক বাঁধ কয়েক বছরের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ে বা ভেঙে যায়। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নির্মাণমান, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা এবং প্রকল্প ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর তদন্তের মুখোমুখি না করার ফলেই একই অনিয়ম ও ভুলের পুনরাবৃত্তি বারবার ফিরে আসছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ একটি নিম্নভূমির ব-দ্বীপ রাষ্ট্র হওয়ায় এবং দেশের অধিকাংশ প্রধান নদীর উৎস সীমানার বাইরে থাকায়, সীমান্তবর্তী নদীগুলোর প্রবাহ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আমাদের বন্যা পরিস্থিতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। এই ভৌগোলিক বাস্তবতায় আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, যৌথ নদী কমিশনকে কার্যকর করা, জরুরি তথ্য আদান-প্রদান এবং আগাম সতর্কীকরণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে কার্যকর দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে আরও অনেক বেশি সক্রিয় ও দূরদর্শী হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু সরকার বা অন্য দেশের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের নাগরিক দায়িত্ব এড়ানোর সংস্কৃতিকে এই গবেষক কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি জানান যে, প্রতিদিন শহর ও গ্রামের অসংখ্য মানুষ প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল এবং গৃহস্থালির বর্জ্য যত্রতত্র ড্রেন, নালা ও খালে ফেলে দিচ্ছেন, যার ফলে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধভাবে খাল দখল এবং জলাধার ভরাট করে আবাসন গড়ে তোলার কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ মানুষ নিজেই বন্ধ করে দিচ্ছে, যা অতিবৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা হয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজেদের বাড়ি ও রাস্তার বুকেই ফিরে আসছে। উন্নত বিশ্বের নাগরিকরা যেভাবে কঠোরভাবে আইন মেনে চলেন, পরিবেশ রক্ষা করেন এবং জনসম্পদকে নিজের মনে করেন, সেই দায়িত্বশীল মানসিকতা আমাদের দেশেও গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংকট উত্তরণে তিনি বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে শতভাগ স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নদী-খাল-জলাধার অবৈধ দখলমুক্ত করে নিয়মিত ড্রেজিং করা, নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীল দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা, প্রতিবেশী দেশের সাথে রিয়েল-টাইম ডাটা শেয়ারিং জোরদার করা এবং যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছেন। পরিশেষে বলা হয়েছে যে, বন্যা কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, প্রশাসনের জবাবদিহিতা এবং সামগ্রিক নাগরিক আচরণের একটি পরীক্ষা; তাই কেবল একে অপরকে দোষারোপ না করে সরকার, প্রশাসন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং দেশের সাধারণ নাগরিক সবাই যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবেই এই ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্পূর্ণ সম্ভব।